২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের কারণসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।

 প্রশ্ন: ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের কারণসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে একটি ছাত্র আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, পরবর্তীতে সরকারের দমন-পীড়ন ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কারণে তা সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। নিচে এই বিপ্লবের প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:

১. কোটা প্রথার পুনর্বহাল (প্রত্যক্ষ কারণ):

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বাতিল করা কোটা পদ্ধতি ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট কর্তৃক পুনর্বহাল করা হয়। এর প্রতিবাদে ১ জুলাই থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফের আন্দোলন শুরু করে। মূলত মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবিই ছিল এই আন্দোলনের প্রাথমিক স্ফুলিঙ্গ।

২. সরকারি দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ড:

আন্দোলন দমাতে সরকার পুলিশ ও দলীয় ছাত্র সংগঠন (ছাত্রলীগ) ব্যবহার করে। ১৫ জুলাই থেকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। নির্বিচারে গুলি ও কয়েকশ ছাত্র-জনতার মৃত্যু এই আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করে।

৩. প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য:

১৪ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য করে ‘রাজাকার’ সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এই মন্তব্য শিক্ষার্থীদের অপমানিত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে, যার ফলে তারা ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলে।

৪. দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার হরণ ও দুঃশাসন:

গত ১৫ বছর ধরে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়া, ভোটাধিকার হরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের কারণে জনমনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে ছিল। জুলাই বিপ্লব ছিল সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।

৫. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দুর্নীতি:

দেশে প্রকট বেকারত্ব, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, নজিরবিহীন দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। অর্থনৈতিক সংকট ও বৈষম্য সাধারণ মানুষকে ছাত্রদের সাথে রাস্তায় নামতে বাধ্য করে।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, কোটা সংস্কার ছিল একটি উপলক্ষ মাত্র। মূলত দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদেই এই বিপ্লব সংঘটিত হয়, যার ফলে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url